গাজা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে সংঘাত মোকাবিলায় আসছে নতুন ‘বোর্ড অব পিস’

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
Jan 18, 2026 - 17:57
গাজা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে সংঘাত মোকাবিলায় আসছে নতুন ‘বোর্ড অব পিস’
ছবি : সংগৃহীত

গাজার সংঘাত নিরসনে প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করা হলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিষদ এখন আরও বৃহত্তর বৈশ্বিক লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। বিশ্বনেতাদের কাছে পাঠানো আমন্ত্রণপত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন এই বোর্ডটিকে জাতিসংঘের বিকল্প বা সমান্তরাল একটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে দাঁড় করানোর পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যেই আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, তুরস্ক ও মিসরসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো শুরু হয়েছে।

শুরুতে গাজায় যুদ্ধবিরতি, পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক তদারকির জন্য এই বোর্ডের কথা বলা হলেও, এর পরিধি এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এবং প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনাকে পাঠানো ট্রাম্পের চিঠিতে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, বোর্ডটির লক্ষ্য বৈশ্বিক। চিঠির সঙ্গে যুক্ত সনদে বলা হয়েছে, এই ‘বোর্ড অব পিস’ হবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার কাজ হবে সংঘাতপীড়িত অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং নির্ভরযোগ্য আইনি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। ট্রাম্পের মতে, টেকসই শান্তির জন্য প্রয়োজন ‘বাস্তববাদী বিচারবোধ’ এবং বারবার ব্যর্থ হওয়া পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরে আসার সাহস। কূটনৈতিকদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্প মূলত জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তুষ্ট এবং এই বোর্ডের মাধ্যমে তিনি নিজস্ব ঘরানার একটি ‘জাতিসংঘ’ তৈরি করতে চাইছেন। ভবিষ্যতে ইউক্রেন যুদ্ধ বা ভেনেজুয়েলার মতো সংকটেও এই বোর্ড হস্তক্ষেপ করতে পারে।

বোর্ডের নেতৃত্ব ও সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিচ্ছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এই বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সদস্যদের একজন হবেন। এছাড়া ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফও নেতৃত্বে থাকবেন। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের সিইও মার্ক রোয়ান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের নামও প্রাথমিক তালিকায় রয়েছে। ‘বোর্ড অব পিস’-এর অধীনে একটি ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ গঠন করা হবে, যা ফিলিস্তিনিদের একটি টেকনোক্র্যাট কমিটির মাধ্যমে গাজার দৈনন্দিন শাসনকাজ তদারকি করবে। মূলত হামাসকে সরিয়ে এই নতুন কাঠামোর মাধ্যমে গাজা শাসনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ইতোমধ্যেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়নকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার নেতাদেরও আমন্ত্রণ পাওয়ার গুঞ্জন রয়েছে। তবে বোর্ডের সদস্য তালিকায় কোনো ফিলিস্তিনি প্রতিনিধির নাম না থাকায় এবং ইসরায়েলের কট্টর সমর্থকদের আধিক্য থাকায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে খোদ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় না করেই বোর্ডটি গঠন করা হচ্ছে, যা তাদের নীতির পরিপন্থী। সমালোচকরা বলছেন, বিদেশি একটি ভূখণ্ডের শাসনব্যবস্থা তদারকির এই পরিকল্পনা অনেকটা ঔপনিবেশিক মানসিকতার পরিচায়ক। এছাড়া ইরাক যুদ্ধে ভূমিকার কারণে টনি ব্লেয়ারের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বোর্ডের গঠনতন্ত্র ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কও কম নয়। খসড়া সনদ অনুযায়ী, বোর্ড বছরে একবার ভোটাভুটি-ভিত্তিক বৈঠক করবে, তবে বৈঠকের এজেন্ডা চূড়ান্ত করার পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে ট্রাম্পের হাতে। এমনকি বিনিয়োগ ও তহবিলের নিয়ন্ত্রণও থাকবে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে চাইছে যেখানে নির্বাচিত কয়েকটি দেশ বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করবে, যা জাতিসংঘের সনদের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বোর্ডের আরও সদস্যের নাম ঘোষণা করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত ‘বোর্ড অব পিস’ বিশ্বমঞ্চে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা-কল্পনা চলছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow