জামায়াতে ইসলামীর ‘পলিসি সামিট ২০২৬’-এর রূপরেখা
আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে যুগান্তকারী সব পরিকল্পনা নিয়ে ‘পলিসি সামিট ২০২৬’-এর রূপরেখা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ঘোষিত রূপরেখায় শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের লক্ষ্যে ‘ভিশন ২০৪০’ এবং তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এখন পর্যন্ত দলটির পক্ষ থেকে যেসব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ঘোষণা করা হয়েছে, তার সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো:
স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা
জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জিডিপির ৬ থেকে ৮ শতাংশ বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতকে বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে ৬৪টি জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের প্রবীণ নাগরিক এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নাগরিক সুবিধা সহজ করতে এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবাকে একীভূত করে ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড’ চালু করা হবে। পাশাপাশি শিশু খাদ্যের ওপর কোনো ভ্যাট না রাখা এবং ‘ফার্স্ট হান্ড্রেড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় প্রসূতি মায়েদের বিনামূল্যে সেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা
উচ্চশিক্ষাকে সহজলভ্য ও মানসম্মত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তার জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ এবং ৫ লক্ষ গ্রাজুয়েটকে ২ বছর মেয়াদি মাসিক ১০ হাজার টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। এছাড়া প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১০০ জন শিক্ষার্থীকে সরকারি খরচে (সুদমুক্ত লোনে) উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো হবে।
কৃষি, শিল্প ও অর্থনীতি
দেশের শিল্পখাতকে এগিয়ে নিতে প্রথম ৩ বছরের জন্য সব ধরণের শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ না বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বন্ধ কলকারখানাগুলো পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপের (PPP) মাধ্যমে পুনরায় চালু করে সেখানে শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা দেওয়া হবে। এছাড়া কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে সুদবিহীন ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন
বেকারত্ব দূরীকরণ ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে একটি নতুন মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ৫ বছরে ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ এবং প্রতিটি উপজেলায় গ্রাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পর্যায়ে ‘জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠনের মাধ্যমে ৫ বছরে ৫০ লাখ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া নারী ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লক্ষ নতুন উদ্যোক্তা এবং স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য বিশেষ স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা হবে।
আইসিটি ও ভিশন ২০৪০
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আইসিটি সেক্টর উন্নয়নে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আইসিটি খাতে ২০ লাখ নতুন চাকরি সৃষ্টি এবং এই খাত থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানিকারকদের সুবিধার জন্য ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে’ স্থাপন এবং দেশীয় আইসিটি সলিউশন ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের ১.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় সাশ্রয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেড় লক্ষ ফ্রিল্যান্সার তৈরির মাধ্যমে দেশকে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে নেওয়াই এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য।
জামায়াতে ইসলামীর এই পলিসি সামিটে মূলত একটি আধুনিক, স্বনির্ভর এবং জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামোর স্বপ্নই প্রতিফলিত হয়েছে।
What's Your Reaction?
মোঃ রহমাতুল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ