দিগন্তজুড়ে হলুদের সমারোহ: মাগুরার মাঠে বাম্পার ফলনের হাতছানি

বিশ্বজিৎ সিংহ রায়, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি, মাগুরাঃ
Jan 2, 2026 - 09:47
 0  4
দিগন্তজুড়ে হলুদের সমারোহ: মাগুরার মাঠে বাম্পার ফলনের হাতছানি

নতুন বছরের শুরুতেই মাগুরার দিগন্তজোড়া মাঠ সেজেছে এক অপরূপ সাজে। পৌষের হাড়কাঁপানো শীত আর ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে যখন ভোরের নরম আলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তখন সরিষা ক্ষেতগুলো যেন জ্বলে ওঠে এক অনন্য দীপ্তিতে। যেদিকে চোখ যায়, মনে হয় প্রকৃতি পরম মমতায় বিছিয়ে দিয়েছে এক বিশাল হলুদ গালিচা। সরিষা ফুলের এই সোনালি আভা আর মৌ-মৌ গন্ধে কৃষকের মনেও দোলা দিচ্ছে বাম্পার ফলনের রঙিন স্বপ্ন।

সরেজমিনে মাগুরা সদরের আবালপুর, দেড়ুয়া, পাকা কাঞ্চনপুর, সত্যপুর, রাঘবদাড়, পাটকেলবাড়ি এবং মহম্মদপুরের ইছামতি বিলসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক মনোরম দৃশ্য। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে বাতাসের তালে দোল খাচ্ছে সরিষার ফুল। কোথাও ফুল ফুটেছে পূর্ণ যৌবনে, আবার কোথাও ধরতে শুরু করেছে ফল।

প্রকৃতির এই নান্দনিক রূপ উপভোগ করতে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সরিষা ক্ষেতগুলোতে ভিড় করছেন নানা বয়সী দর্শনার্থী। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলতে কেউ হারিয়ে যাচ্ছেন হলুদ সমুদ্রে, কেউবা মুঠোফোনে ছবি তুলে কিংবা লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে সেই সৌন্দর্য ভাগ করে নিচ্ছেন বন্ধুদের সঙ্গে। সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদে এখন বিরাজ করছে এক উৎসবমুখর প্রাণচাঞ্চল্য।

স্বল্প খরচ ও পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় সরিষা চাষে ঝুঁকছেন জেলার কৃষকরা। মহম্মদপুর উপজেলার কৃষক জাকির হোসেন বলেন, “দুই বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছি। খরচ ও পরিশ্রম দুটোই কম, তাই এটি আমাদের জন্য বেশ লাভজনক। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার ভালো ফলনের আশা করছি।”

বালিয়াডাঙ্গার কৃষক নাজিম উদ্দিন জানান, তাঁর তিন বিঘা জমি এখন ফুলে ফুলে ভরা। আর কিছুদিন পরেই ফল আসা শুরু করবে এবং দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে। একই সুরে ছয়চার গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বছরই সরিষা চাষ করে লাভবান হই। এবারের আবহাওয়া দেখে মনে হচ্ছে ফলন গতবারের চেয়েও ভালো হবে।”

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার জেলায় সরিষার বাম্পার ফলনের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি মৌসুমে জেলায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৫ হাজার ৯০ হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ২২ হাজার ৮৯৩ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সদরে ১০ হাজার ৪০৮ হেক্টর, শ্রীপুরে ১ হাজার ৪০৫ হেক্টর, শালিখায় ৭ হাজার ৩৬০ হেক্টর এবং মহম্মদপুরে ৩ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে।

মাগুরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. তাজুল ইসলাম বলেন, “এ বছর আবহাওয়া কৃষকদের অনুকূলে রয়েছে। তীব্র শীত বা কুয়াশায় সরিষার তেমন ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। আমরা আশা করছি এবার বাম্পার ফলন হবে। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।”

শীতের সকালে শিশিরভেজা সরিষা ফুলের এই সোনালি হাসি শুধু মাঠের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং নতুন বছরে কৃষকের চোখে বুনে দিয়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও নতুন দিনের আশার আলো।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow