উচ্চ আদালতের রায় অমান্য করে জলঢাকায় চলছে তিস্তা নদীর বালু বিক্রি

হাসানুজ্জামান সিদ্দিকী হাসান, জলঢাকা প্রতিনিধি, নীলফামারীঃ
Jan 15, 2026 - 12:51
 0  3
উচ্চ আদালতের রায় অমান্য করে জলঢাকায় চলছে তিস্তা নদীর বালু বিক্রি

‎উচ্চ আদালত ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কড়া নির্দেশনার পরেও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে নীলফামারীর জলঢাকায়।

‎সরকারী কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই নীলফামারীর জলঢাকার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বড় তিস্তা নদী শৌলমারী  ইউনিয়নের বাধ হতে ট্রলি দিয়ে মাটি কেটে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে বালু খেকোরা। ফলে সরকার হারাচ্ছে  রাজস্ব। কারো নজরদারী না থাকায়
এদিকে তারা অনেক বেশি ‘বেপরোয়া’ হয়ে উঠেছে।

‎ উপজেলা সদর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও একই অবস্থা।

‎জলঢাকা উপজেলায় সরকারি নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধ ভাবে বড় তিস্তা নদীর বালু উত্তোলন করে  বিক্রির মহোৎসব চলছে। ফলে প্রশাসনকে জানালে মিলে দায়সারা উত্তর আসতেছি, দেখতেছি ,দেখব অথবা ভূমি কর্মকর্তাকে পাঠাচ্ছি!

‎স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তাদের নীরবতায় বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। তারা বলছেন প্রশাসনের নিকট একাধিকবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না। এদিকে উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার এসবের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বরং প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বালু খেকোরা প্রকাশ্যেই এসব অপকর্ম করে যাচ্ছে।

‎যদিও স্থানীয় প্রশাসন বলছে, এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চলমান রয়েছে। 

‎জানাযায় উপজেলার গোলমুন্ডা  ইউনিয়নের ঘাটের পার,সাইফুন বাজারের বড় তিস্তা নদী, ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের ঘাটের পার, বাধ,বালাগ্রাম ইউনিয়নের তুহিনের বাজার বাধ,এলাকায় ভোর ৫ টা হতে সকাল ৯ টা পর্যন্ত, আর সন্ধ্যা ৬ টা হতে সারা রাত চলে  বালু বিক্রির মহোৎসব।

‎এদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে বড় তিস্তা ও বুড়ি তিস্তা  নদীর বিভিন্ন জায়গা থেকে একের পর এক ট্রলি দিয়ে  বালু উত্তোলন করে ও উত্তোলন করা বালু বিক্রি করায়  নিয়মিত হুমকির মুখে পড়েছে বাধ সহ ফসলি জমি।

‎বুধবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত বড় তিস্তা নদীর ডাউয়াবাড়ী
‎ঘাটের পার ও বাধ , বালাগ্রামের তুহিনের বাজার বাধ সহ বড় তিস্তা নদীর গোলমুন্ডা ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড সাইফুন বাজার, শৌলমারী ইউনিয়নের নদীর পাড় এলাকার  অন্তত ৩-৪ টি পয়েন্ট থেকে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

‎অপরদিকে নদীর চরের কৃষি জমিগুলোও ছাড় দিচ্ছে না বালু খেকোরা। অপরিকল্পিত ভাবে নদী এবং চরের কৃষি জমিগুলো থেকে বালু উত্তোলনের ফলে বুড়ি তিস্তা ও বড় তিস্তা নদীর ডান বাম তীরে অবস্থিত গ্রামীন ও বাধের কাঁচা সড়কে চলাচলে চরম দৃর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

‎উপজেলার গোলমুন্ডা ইউনিয়নের ঘাটের পার ও ডাউয়াবাড়ী সহ বালাগ্রাম, শৌলমারী  ইউনিয়নের বুড়ি তিস্তা ও বড় তিস্তা নদীর বাধে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ট্রলি লাগিয়ে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছেন বালু খেকোরা। আর এই বালু নিয়ে যাওয়ার কারনে বাধ সহ কাচাঁ সড়ক গুলো ভেঙে যাওয়ায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ সড়ক গুলোয় শুস্ক মৌসুমে ধুলাবালি আর বর্ষা মৌসুমে কাদা হয়ে চলাচলে দৃর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে  জনগনকে।

‎সেখানে স্থানীয় গ্রাম পুলিশের সাথে কথা হলে তিনি এ প্রতিনিধিকে বলেন, আমি কিছু জানিনা। এদিকে বালু ব্যাবসায়ীর লোকজন  বলেন আপনারা যা পারেন করেন।

‎বালু বিক্রির হোতাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায় নি।

‎এদিকে সাংবাদিকরা বালু বিক্রির  তথ্য চাইতে গেলে বালু  ব্যবসায়িদের নিযুক্ত ব্যাক্তিরা সহ ট্রলির ড্রাইভার ও আরো কয়েকজন ব্যাক্তি সাংবাদিকদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ,,সন্মানহানী করা সহ বিভিন্ন হুমকি দেন।

‎একই এলাকার বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যেখান থেকে বালু উত্তোলন করছে জায়গাটি আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তি একাধিকবার বাধাদিলেও আমাদের কোন কথাই শুনেনি বরং আরো বেপরোয়া হয়ে সেখান থেকে  বালু বিক্রি করছে ট্রলি দিয়ে। তারা আরো বলেন প্রশাসন কে জানালেও তারা নিরব। এবং কাঁচা সড়কগুলোতে ট্রলি চলার কারনে সড়কের বেহাল অবস্থার সৃস্টি করেছে।যা চলাচলের অনুপযোগী। এবিষয় গোলমুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান  ও শৌলমারী  ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান জামান বলেন, আমাকে এই বিষয়ে কেউ জানাননি তাই আমি কিছু বলতে পারবোনা।

‎উপজেলা নির্বাহী অফিসার জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন  বলেন, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও থেকে আমাদের কাছে অভিযোগ আসে।এবিষয়ে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।

‎এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক নায়িমুজ্জামান বলেন, কোথায় বালু উত্তোলন ও বিক্রি  হচ্ছে আমায় লিখে দেন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের কোনো ভাবেই ছাড় দেয়া হবে না বলে জানান তিনি।

‎উল্লেখ্য, গত ২০০৯ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বোমা মেশিন ব্যবহার ও বালু উত্তোলন বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন উচ্চ আদালত।

‎এছাড়াও বালু মহাল এবং মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ সালের নীতিমালা অনুযায়ী পাম্প বা অন্য কোন মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন,বিক্রি  করা যাইবে না। ওই আইনের (৩) উপ-ধারা (২) এ উল্লেখ রয়েছে ড্রেজিং কার্যক্রম বাল্কহেড বা প্রচলিত বলগেট ড্রেজার ব্যবহার করা যাইবে না। এবং সর্বোপরি এভাবে বালু উত্তোলন আইনত দন্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচ্য হবে।

‎এছাড়া ২০১৯ সালের ১৭ই জুন (সোমবার) মহামান্য হাইকোর্ট বলেছেন ”নদী থেকে বালু উত্তোলন ও বিক্রি  বন্ধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে না পারলে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চাকরি ছেড়ে দিতে”।

‎বিশ্বব্যাপী নদীর আইনগত সত্তা ধারণার সূচনা হয়েছে কলম্বিয়ার আদালতের একটি রায় থেকে। নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ বিশেষ নদীকে লিগ্যাল পারসন ঘোষণা করা হয়েছে।
‎২০১৭ সালের মার্চ মাসে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে গঙ্গা ও যমুনা নদীসহ বাস্তুতন্ত্রকে জীবন্ত মানুষের মর্যাদা দিয়েছে।

‎এছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের ২০১৯ সালের একটি রায়ে দেশের নদীগুলোকে জুরিসটিকপারসন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামের সংগঠনের রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে তুরাগ নদীকে লিভিং এনটিটি ঘোষণা করা হলেও পরে দেশের সব নদীর ক্ষেত্রে এ রায় বহাল রাখা হয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow