নতুন বছরে বেরোবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশা
শীতকালীন ছুটি উপলক্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরে একাডেমিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় ক্যাম্পাসজুড়ে নেমে এসেছে নীরবতা। শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন এলাকা ও বিভিন্ন আবাসিক হল প্রাঙ্গণ এখন অনেকটাই ফাঁকা। কনকনে শীত আর কুয়াশার চাদরে ঢাকা ক্যাম্পাসে নেই ক্লাসে যাওয়ার ব্যস্ততা, নেই বন্ধুবান্ধবের আড্ডা। ছুটিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাড়ি ফিরে গেলেও কেউ কেউ থেকে গেছেন ক্যাম্পাসেই—কেউ পড়াশোনা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে, কেউ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায়, আবার কেউ বাস্তবতার চাপে।
এই নীরব ক্যাম্পাসেই নতুন বছর ২০২৬ নিয়ে ভাবছেন বেরোবির শিক্ষার্থীরা। তাদের আশা, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের কথা তুলে ধরা হলো এই প্রতিবেদনে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২২–২৩ সেশনের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান মেঘ বলেন, নতুন বছর হোক আত্মসমালোচনা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের বছর। তার মতে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় একটি নবীন হলেও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্য, মেধা ও আগ্রহ যদি সঠিকভাবে লালন করা যায়, তবে বেরোবি দ্রুতই একটি মানসম্মত গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিতে পারে। তবে ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সহনশীল একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তোলাই নতুন বছরের প্রধান প্রত্যাশা।
ম্যানেজমেন্ট এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের ২০২০–২১ সেশনের শিক্ষার্থী কানিজ ফারহানা মুভা বলেন, “২০২৬ সাল হোক বেরোবি শিক্ষার্থীদের নতুন স্বপ্ন আর নতুন উদ্যমের বছর। আমরা চাই একটি শিক্ষার্থী–বান্ধব, নিরাপদ ও গবেষণামুখী ক্যাম্পাস। নিয়মিত ক্লাস, মানসম্মত শিক্ষা ও আধুনিক ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অনেক বেড়ে যাবে।”
একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন বিভাগের ২০২৩–২৪ সেশনের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান দিপু বলেন, নতুন বছর তার কাছে শুধু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়, বরং নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ। তিনি বলেন, “আমি চাই পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে আরও বেশি যুক্ত হতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যদি প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়ানো হয়, তাহলে আমরা বিশ্বমঞ্চের জন্য প্রস্তুত হতে পারবো।”
বাংলা বিভাগের ২০২৩–২৪ সেশনের শিক্ষার্থী আব্দুল মালেক বলেন, নতুন বছরে তার প্রত্যাশা একটি সেশনজটমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি মনে করেন, নিয়মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ, স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষক–শিক্ষার্থীর মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠলে শিক্ষার মান অনেকটাই উন্নত হবে।
একই বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, “স্বপ্ন বড় হলেও শিক্ষার ভিত মজবুত না হলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালে আমরা চাই নিয়মিত ক্লাস, ন্যায্য পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস পরিবেশ। বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য আবাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি।”
জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২২–২৩ সেশনের শিক্ষার্থী নাজনীন মুশফিকা বলেন, নতুন বছর মানেই পুরোনো ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, “২০২৬ সালে আমি নিজেকে আরও শৃঙ্খলিত, দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।”
ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২২–২৩ সেশনের শিক্ষার্থী আফসানা ইসলাম আর্নিকা ইসলাম বলেন, নতুন বছর ২০২৬ আমার কাছে আত্মউন্নয়ন ও সচেতনতার প্রতীক। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে চাই পড়াশোনার পাশাপাশি ইতিহাসচর্চা, গবেষণা ও পাঠাভ্যাসে আরও মনোযোগ দিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সেমিনার, জার্নাল ক্লাব ও গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীরা আরও সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে একটি রাজনীতি–সহিংসতামুক্ত, শান্ত ক্যাম্পাস প্রত্যাশা করি।
শিক্ষার্থীদের মতে, নতুন বছরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন গবেষণামুখী শিক্ষা, ডিজিটাল স্টুডেন্ট সার্ভিস, আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ সহায়তা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তৃতি। একই সঙ্গে একটি সহনশীল, মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক ক্যাম্পাস সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।
শীতকালীন ছুটি শেষে ১১ জানুয়ারি থেকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন বছরে সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—নতুন সূচনা, নতুন সম্ভাবনা আর একটি সমৃদ্ধ বেরোবি।
What's Your Reaction?
মাসফিকুল হাসান, বেরোবি প্রতিনিধি, রংপুরঃ