গোদাগাড়ীতে আলুর বাম্পার ফলনের হাতছানি: বদলাতে পারে পুরো উপজেলার অর্থনীতির চিত্র

সেলিম সানোয়ার পলাশ, গোদাগাড়ী প্রতিনিধি, রাজশাহীঃ
Jan 8, 2026 - 17:10
 0  12
গোদাগাড়ীতে আলুর বাম্পার ফলনের হাতছানি: বদলাতে পারে পুরো উপজেলার অর্থনীতির চিত্র

বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা। বর্তমানে উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে বাতাসের তালে দোল খাচ্ছে আলুর কচি পাতা। অনুকূল আবহাওয়া আর আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগে এবার গোদাগাড়ীতে আলুর ‘বাম্পার ফলন’ আশা করছেন স্থানীয় কৃষকরা। গত মৌসুমে ভালো দাম পাওয়া এবং বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ইতিবাচক থাকায় কৃষকদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে এই আলু চাষ কেবল কৃষকের ভাগ্য নয়, বদলে দিতে পারে পুরো উপজেলার অর্থনীতির চিত্র।

লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদের রেকর্ড
চলতি ২০২৪-২৫ মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি। তবে বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে অনেক বেশি। গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় ২ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে উপজেলার মোহনপুর, পাকড়ী, রিশিকুল, দেওপাড়া ইউনিয়ন এবং গোদাগাড়ী ও কাঁকনহাট পৌর এলাকায় আলু চাষে রীতিমতো জোয়ার দেখা দিয়েছে।

অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাইহীন মাঠ
উপজেলা কৃষি অফিসের মতে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এখন পর্যন্ত আলুর ক্ষেতে মড়ক বা ধসা জাতীয় কোনো রোগবালাইয়ের আক্রমণ দেখা দেয়নি। তীব্র শীত অনুভূত হলেও ফসলের কোনো ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। মাঠপর্যায়ে আলুর গাছগুলো বেশ সতেজ ও সবল রয়েছে।

চাহিদা ও আলুর জাত
গোদাগাড়ীতে উৎপাদিত আলুর কদর রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারি বাজারে। এখানকার চাষিরা মূলত ডায়মন্ড, এস্টারিক্স (লাল আলু) এবং কার্ডিনাল জাতের আলু বেশি আবাদ করেন। তবে অধিক ফলনের আশায় অনেকে বার্মা, গ্রানোলা ও কুপরিসুন্দরী জাতের আলুরও চাষ করেছেন। বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে এই আলু দেশের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খরচ নিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তা
মাঠে ফসলের এমন হাসিখুশি অবস্থা থাকলেও কৃষকদের মনে রয়েছে খরচের দুশ্চিন্তা। স্থানীয় কৃষকরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে আলু রোপণ করতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সার (এমওপি, ডিএপি, টিএসপি), কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ গত বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। অনেক চাষি অভিযোগ করেন, পর্যাপ্ত সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে তাদের।

ফলনের প্রত্যাশা ও ঝুঁকি
কৃষকদের মতে, যদি কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটে, তবে এবার প্রতি বিঘায় ১০০ থেকে ১২০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। তবে শেষ মুহূর্তে সারের দাম বৃদ্ধি কিংবা আকস্মিক কোনো দুর্যোগ বা মড়ক দেখা দিলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না প্রান্তিক চাষিরা।

কৃষি বিভাগের তৎপরতা
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও উন্নত মানের সার-বীজ ব্যবহারে উৎসাহিত করছেন। মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা কৃষকদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন, যাতে সঠিক সময়ে সেচ ও নিড়ানির কাজ সম্পন্ন করা যায় এবং সম্ভাব্য রোগবালাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

কৃষিবিদদের মতে, গোদাগাড়ীর অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। বর্তমান আবহাওয়া বজায় থাকলে এবং কৃষকরা উৎপাদিত আলুর সঠিক বাজারমূল্য পেলে, এবারের আলু চাষ বরেন্দ্র জনপদের অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow