কাপ্তাইয়ে শ্মশানের অভাবে চরম দুর্ভোগে ৫০০ সনাতন পরিবার: মৃত্যুর পরও মিলছে না ‘এক চিলতে মাটি’
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদীর কলতানে মুখরিত রাঙ্গামাটির কাপ্তাই জনপদ। প্রকৃতির এই অপরূপ মায়ায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছে কয়েকশ সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবার। জীবদ্দশায় যে মাটিকে তারা পরম মমতায় আগলে রাখেন, মৃত্যুর পর সেই মাটিতেই শেষ বিদায়ের জন্য মিলছে না এক চিলতে জায়গা। একটি নির্দিষ্ট মহাশ্মশানের অভাবে কাপ্তাই উপজেলার প্রায় ৫০০ হিন্দু পরিবারের অন্তিম যাত্রা আজ পরিণত হয়েছে এক দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতায়।
উপজেলার ৪ নং কাপ্তাই ইউনিয়ন এবং ৩ নং চিৎমরম ইউনিয়নে কয়েক দশক ধরে বসবাসরত এই পরিবারগুলোর সংকট এখন চরমে। প্রিয়জনের মৃত্যুর পর মরদেহ সৎকারের জন্য স্থানীয় কোনো শ্মশান না থাকায় স্বজনদের পাড়ি দিতে হচ্ছে ১০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরের পথ। যা শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও অসম্মানজনক।
মন্দির পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ২৯ জুন উপজেলা সমন্বয় সভায় ব্যাঙছড়ি এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীরে একটি শ্মশান নির্মাণের রেজুলেশন পাস হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, গত এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও বন বিভাগের জমি সংক্রান্ত জটিলতায় আজও আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি।
লকগেইট শ্রী শ্রী জয়কালী মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়তোষ ধর পিন্টু আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা শুধু একটু সম্মানের সাথে বিদায় চাই। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজলে আমাদের শেষ আশ্রয়ের ঠিকানাটি আটকে আছে।”
বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কাপ্তাই উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো. দিলদার হোসেন। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার এত বছর পরও ৫০০ পরিবারকে তাদের প্রিয়জনের শেষকৃত্যের জন্য অন্য এলাকায় ছুটতে হচ্ছে, এটি অত্যন্ত অমানবিক। আমার দায়িত্বকালে এ নিয়ে রেজুলেশন পাস হলেও বন বিভাগ ও প্রশাসনের সমন্বয়হীনতায় কাজটি ঝুলে আছে। মানবিক দিক বিবেচনায় দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসন করা উচিত।”
এ প্রসঙ্গে ৪ নং কাপ্তাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আবদুল লতিফ জানান, প্রস্তাবিত জায়গাটি বন বিভাগের আওতাধীন হওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিষয়টি সমাধানের জন্য উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রুহুল আমিন সরেজমিনে জায়গাটি পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করেছেন।
এদিকে, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ সদস্য ক্যওসিমং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিলেও স্থানীয়দের মনে হতাশা কাটছে না। মন্দির কমিটির প্রধান উপদেষ্টা সমলেন্দু বিকাশ দাশ, সভাপতি প্রশান্ত ধর এবং স্থানীয় বাসিন্দা প্রদীপ দে ও পিন্টু চক্রবর্তীদের একটাই প্রশ্ন— একটি শেষ বিদায়ের স্থানের জন্য আর কত যুগ অপেক্ষা করতে হবে?
কাপ্তাইয়ের এই ৫০০ পরিবারের এখন একটাই আকুল আবেদন— আর যেন কোনো মৃতদেহকে সৎকারের জন্য শত মাইল পথ পাড়ি দিতে না হয়। নিজ এলাকাতেই যেন মেলে শান্তির শেষ ঠিকানা।
What's Your Reaction?
রিপন মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ