অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যই তারেক রহমানের বড় চ্যালেঞ্জ
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী 'টাইম ম্যাগাজিন'-এর এক বিশ্লেষণ বলছে— নতুন এই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো দেশের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে বিএনপির পাশাপাশি অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী; বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে তাদের সমর্থন বেড়েছে। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপি সরকার স্বাধীনভাবে আইন প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে টাইম ম্যাগাজিন সতর্ক করে বলেছে, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি নিয়ে তরুণ প্রজন্মের যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে, তা রাতারাতি দূর হবে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মূলত অর্থনীতির চাকা সচল করার দিকেই সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপির আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেশে ৯ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এছাড়া, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হলেও, রাজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনও দৃশ্যমান নয়। এই লক্ষ্য পূরণে বেসরকারি বিনিয়োগও বর্তমানের ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল মুদ্রানীতির ব্যর্থতা নয়, বরং বণ্টনব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি। দেশের কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশই কৃষিনির্ভর। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং শহরের বাজারে দাম কমাতে প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ভাঙতে হবে। এজন্য ফসল কাটার পরবর্তী লজিস্টিক খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন হলো রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আইএমএফের ঋণের চেয়েও দেশের রিজার্ভ সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখছে। অবৈধ হুন্ডি এড়িয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোয় গত কয়েক বছরে রেমিট্যান্স প্রবাহে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিদেশে শ্রমবাজার দুর্নীতি ও শোষণে জর্জরিত। নতুন করে অনেক দেশ বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার সংকুচিত করেছে। অর্থনীতিকে বাঁচাতে এই খাতের সংস্কার ও নতুন বাজার খোঁজা অত্যন্ত জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ড. খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদের মতে, বৃহৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান প্রভাব ফেলে এমন 'ছোট ছোট প্রকল্পের' দিকেও নজর দিতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভঙ্গুর আর্থিক খাত সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি। এর ওপর ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি বাণিজ্যে যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, তা মোকাবিলায় এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।
অর্থনীতির পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতিতেও তারেক রহমানকে হাঁটতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।
সার্ক নাকি আসিয়ান: নির্বাচনি ইশতেহারে আসিয়ানে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রথম সংবাদ সম্মেলনে সার্কের ওপর জোর দিয়েছেন তারেক রহমান। অথচ সার্ক বর্তমানে একটি অকার্যকর সংস্থা। অন্যদিকে আসিয়ানে যোগ দিলে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের মতো কাঁটা বিছানো রয়েছে।
ভারত সম্পর্ক: শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং ভিসা জটিলতায় সৃষ্ট অবিশ্বাসের আবহে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক বর্তমানে তলানিতে। ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত পানিবণ্টন ও বাণিজ্য বাধা দূর করতে বিএনপিকে অত্যন্ত হিসেবি পা ফেলতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য: সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষাটি হবে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান রূপকার। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র দেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার এবং জ্বালানি খাতের বড় বিনিয়োগকারী। উভয় পরাশক্তিই এখন তারেক রহমান সরকারের সুস্পষ্ট পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে।
এক বিশাল প্রত্যাশা এবং পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক বংশমর্যাদার বাইরে গিয়ে তিনি নিজেকে একজন সফল 'স্টেটসম্যান' বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন কি না, তার উত্তর নির্ভর করছে এই বহুমুখী সংকট তিনি কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারেন তার ওপর।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ