‎“রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষা—বাংলা ভাষা”

আলী আকবর শুভ, কুবি প্রতিনিধি, কুমিল্লাঃ
Feb 21, 2026 - 11:24
Feb 21, 2026 - 11:24
‎“রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষা—বাংলা ভাষা”

‎আপনি কথা বলতে চান, আপনার মনের ভাব অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে চান। কিন্তু যে ভাষায় আপনাকে কথা বলতে বাধ্য করা হচ্ছে, সেই ভাষা আপনার কাছে বোধগম্য নয়। তখন কি আপনার মত প্রকাশের অধিকার সত্যিই থাকে?

‎ঠিক এমনই এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল বাঙালি জাতি—নিজের মাতৃভাষা বাংলাকে ঘিরে।বাংলার সাহসী সন্তানেরা সেটা মেনে নেয়নি। সেদিন রাজপথ লাল হয়েছিল তরতাজা তরুণদের রক্তে। বুক পেতে গুলি মুখে বুক হয়েছে ঝাঁঝরা। তারাই আমাদের ভাষার গৌরবময় ইতিহাসের অমর অধ্যায়। নিজের মনের ভাব প্রকাশের অধিকার আদায় করতে গিয়ে যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আজকের এই দিনে বাংলাদেশের মানুষ তাঁদেরই স্মরণে—১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে দিন শুরু করবে।

‎১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির পর সদ্য জন্ম নেওয়া পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিলেন বাংলাভাষী। অথচ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে এককভাবে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা শুরু হয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সরাসরি অবমূল্যায়ন। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান ছাত্রসমাজ।

‎১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সরকার জারি করেছিল ১৪৪ ধারা, যেখানে সমাবেশ ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু ভাষার প্রশ্নে আপস করতে রাজি ছিল না ছাত্রসমাজ। তারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজপথে নেমে আসে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে বুক পেতে দেন তরুণ ছাত্ররা। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না-জানা আরও অনেক সাহসী সন্তান সেদিন শহীদ হন। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ, আর ইতিহাসে রচিত হয় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

‎এই আত্মত্যাগের ফলেই বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। তবে ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না—এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়, ন্যায়বোধ ও স্বাধিকারের চেতনার প্রথম বিস্ফোরণ। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই গড়ে ওঠে ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পথ।

‎আজও মানুষ তাঁদের ত্যাগের কথা মনে মনে ধারণ করে রেখেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২১–২২ সেশনের শিক্ষার্থী ফারজানা হক নিয়ন জানান,

‎“২১শে ফেব্রুয়ারি আমার কাছে শুধু একটি দিন নয়, এটি আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই দিনে আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই বীর ভাষা শহীদদের, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমি আজ স্বাধীনভাবে আমার মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলতে পারছি।

‎বাংলা ভাষা আমার মায়ের মুখ থেকে শোনা প্রথম শব্দ, আমার শৈশবের হাসি-কান্না, আমার স্বপ্ন আর অনুভূতির সবচেয়ে আপন প্রকাশ।”

‎তিনি আরও জানান,

‎“১৯৫২ সালের এই দিনে তরুণ ছাত্ররা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য, মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তাঁদের এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আজ বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

‎তাদের সেই ত্যাগ আজ আমাকে মাথা উঁচু করে বলতে শেখায়—আমি বাংলাভাষী, এটিই আমার গর্ব।”

‎শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে নির্মিত হয় শহীদ মিনার। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে খালি পায়ে মানুষ ছুটে আসে এই মিনারে।

‎এই দিন স্মরণ করে রাখতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের ২০২২–২৩ সেশনের শিক্ষার্থী দিলোয়ার হোসেন বলেন,

‎“একুশের অঙ্গীকার—১৯৫২ সালে আমাদের পূর্বপুরুষরা রক্তের বিনিময়ে ভাষার অধিকার রক্ষা করেছিলেন। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি—এখানে একটি আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হোক। একুশের চেতনা কেবল স্মৃতির রোমন্থন নয়, বরং ভাষাকে জ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইনস্টিটিউট হবে সেই চেতনার বাস্তব প্রতিফলন।”

‎ভাষা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছে। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

‎আজ আমরা নির্ভয়ে বাংলায় কথা বলি, লিখি, গান গাই। কেউ আর আমাদের বুকে গুলি চালায় না ভাষা বলার অপরাধে।

‎যাদের রক্তে বাংলা পেয়েছিল মুক্তি,

‎যাদের ত্যাগে আমরা পেয়েছি নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার—

‎তাঁদের সেই প্রতিরোধের শক্তি, নিজের জীবন উৎসর্গ করার সাহস আজকের দিনেও শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow